NiUKo Inc.

অগ্নিদগ্ধ সামিয়ার চিকিৎসা ও পুনর্বাসন: অবসান হলো একটি পরিবারের দীর্ঘ কষ্টের, পাশে দাঁড়ালো ‘নিউকো’

একটু উষ্ণতার খোঁজে আগুনের কাছে যাওয়াটাই কাল হয়েছিল সাত বছরের শিশু সামিয়ার। কিন্তু দীর্ঘ দুর্ভোগ আর চিকিৎসার অনিশ্চয়তা পেরিয়ে অবশেষে নতুন জীবনের আলো দেখছে সে। অদম্য মানবিকতা আর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার হাত ধরে সামিয়াকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি তার পুরো পরিবারকে স্বাবলম্বী করে তুলেছে সামাজিক সংগঠন ‘নিউকো’ (NiUKo)।

 

অবর্ণনীয় সেই কষ্টের দিনগুলো

মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার খাসপ্রেমনগর গ্রামের এক হতদরিদ্র রিকশাচালক বাদশা মিয়ার মেয়ে সামিয়া। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে তীব্র শীত নিবারণের জন্য আগুন পোহাতে গিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয় সে। আগুনের লেলিহান শিখায় তার শরীরের সম্মুখভাগ মারাত্মকভাবে ঝলসে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও অর্থাভাবের কারণে চিকিৎসা অসমাপ্ত রেখেই বাড়ি ফিরতে বাধ্য হয় পরিবারটি।

পরবর্তীতে কোভিড-১৯ মহামারীর লকডাউন এবং চরম আর্থিক সংকটে স্থবির হয়ে পড়ে সামিয়ার চিকিৎসা। সময়ের সাথে সাথে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে; সামিয়ার বুকের বাম পাশের চামড়া ও মাংস বৃদ্ধি পেয়ে মুখের থুতনির সাথে লেগে যায় এবং তার মুখ নিচের দিকে বাঁকা হয়ে যায়।

 

‘নিউকো’-এর উদ্যোগ ও সফল সার্জারি

দীর্ঘ দুই বছর মানবেতর জীবনযাপনের পর ২০২১ সালের শেষের দিকে সামিয়ার এই কষ্টের কথা জানতে পারে ‘নিউকো’ (NiUKo)। সংগঠনটির সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ও তদারকিতে সামিয়াকে ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ণ ও প্লাষ্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়।

  • প্রথম অপারেশন (ডিসেম্বর ০৭, ২০২১): সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সামিয়ার মুখ থেকে বুকের চামড়া আলাদা করা হয়।
  • দ্বিতীয় অপারেশন (ডিসেম্বর ৩০, ২০২১): আরেকটি জটিল সার্জারির মাধ্যমে তার বুকে নতুন চামড়া প্রতিস্থাপন (Skin Grafting) করা হয়।

পরবর্তীকালে দীর্ঘ ১৮ মাসের ফলোআপ, বিশেষ ফিজিওথেরাপি ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যাবতীয় যত্নের মাধ্যমে সামিয়া এখন পুরোপুরি সুস্থ ও স্বাভাবিক।

 

চিকিৎসা পেরিয়ে স্থায়ী পুনর্বাসন ও স্বাবলম্বিতা

‘নিউকো’ কেবল সামিয়ার তাৎক্ষণিক চিকিৎসাতেই তাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং পরিবারটির স্থায়ী অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য গ্রহণ করেছে দূরদর্শী পদক্ষেপ।

১. ভবিষ্যতের নিরাপত্তা: সামিয়ার নামে ব্যাংকে একটি স্থায়ী আমানত বা ফিক্সড ডিপোজিট (FDR) এবং একটি সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়া হয়েছে, যা তার পরবর্তী পড়াশোনা ও সুরক্ষায় অবদান রাখবে।

২. স্থায়ী কর্মসংস্থান: সামিয়ার বাবা বাদশা মিয়ার স্থায়ী রোজগারের পথ সুগম করতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে তাকে একটি আধুনিক ব্যাটারিচালিত অটো রিকশা উপহার দেওয়া হয়েছে।

সংগঠনের বক্তব্য:

“আমরা শুধু সামিয়ার শৈশবকে ক্ষতযুক্ত হওয়া থেকে বাঁচাতে চেয়েছি তা নয়, বরং চেয়েছি পরিবারটি যেন আর কখনও অর্থের অভাবে চিকিৎসা বা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়। সামিয়ার মুখের এই অনাবিল হাসিই আমাদের মানবিক যাত্রার সবচেয়ে বড় সার্থকতা।”

তীব্র অন্ধকার কেটে সামিয়ার পরিবারে এখন বইছে স্বস্তির বাতাস। বাদশা মিয়া এখন নিজের অটো রিকশা নিয়ে প্রতিদিন উপার্জনে বের হন, আর সামিয়া ফিরে পেয়েছে তার চিরচেনা শৈশব ও নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন। একটি মানবিক উদ্যোগ কীভাবে একটি পুরো পরিবারের ভাগ্য বদলে দিতে পারে, ‘নিউকো’ ও সামিয়ার এই গল্প তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত।